Subscribe Us

header ads

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাস

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাস


(West Bengal Legislative Assembly Election History)

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাস রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ভোটার আচরণের একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যটি একাধিক রাজনৈতিক পর্বের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে কখনো কংগ্রেস, কখনো বামফ্রন্ট, আবার সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। এই ইতিহাস বুঝলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও প্রশাসনিক ধারার পরিবর্তন পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।


স্বাধীনতার পর প্রথম বিধানসভা নির্বাচন হয় ১৯৫২ সালে। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় আসন সংখ্যা ছিল ২৩৮। কংগ্রেস দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং বিধান চন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী হন। এই সময় থেকে প্রায় দেড় দশক রাজ্যের রাজনীতিতে কংগ্রেসের দাপট বজায় থাকে। ১৯৫৭ এবং ১৯৬২ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস জয়ী হয়, যদিও বামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টি, ধীরে ধীরে শক্তি বাড়াতে শুরু করে।

১৯৬৭ সাল থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। এই সময় অজয় মুখার্জি মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৬৯ সালেও একই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দশকটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকার ভাঙা–গড়া এবং একাধিকবার রাষ্ট্রপতি শাসনের জন্য পরিচিত।

১৯৭১ ও ১৯৭২ সালের নির্বাচনে আবার কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরে আসে, তবে এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট বিপুল জয় লাভ করে এবং জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর টানা ৩৪ বছর, অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত, বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গ শাসন করে। এটি ভারতের ইতিহাসে কোনো নির্বাচিত সরকারের দীর্ঘতম শাসনকালগুলোর একটি। এই সময়ে ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং শিল্পনীতি রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। পরবর্তী নির্বাচনে বামফ্রন্ট বারবার ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং শেষ দিকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হন।

২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন আবার এক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে বামফ্রন্টকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হন এবং দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটে। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে বিজেপি খুব সীমিত সংখ্যক আসন পায়।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের রাজনীতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস আবার বিপুল জয় লাভ করে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে বিজেপি উল্লেখযোগ্যভাবে আসন সংখ্যা বাড়িয়ে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এই নির্বাচনে কোনো আসন পায়নি, যা রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

সার্বিকভাবে দেখলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বে কংগ্রেসের আধিপত্য, এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, তারপর দীর্ঘ বামফ্রন্ট শাসন এবং সর্বশেষ তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ও ধারাবাহিক ক্ষমতায় থাকা। সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপির উত্থান রাজ্যের রাজনীতিকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলেছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি, তবে তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষক নিয়োগের মতো কাজ চলছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাস জানা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে বুঝতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

Post a Comment

1 Comments