Subscribe Us

header ads

RSS (Rashtriya Swayamsevak Sangh): ইতিহাস, প্রভাব ও বিতর্ক

RSS (Rashtriya Swayamsevak Sangh) নিয়ে—ওরা আসলে কতটা “বদমাশ” বা কতটা বিপজ্জনক, আর সেটা সাধারণ মানুষের সাথে শেয়ার করা উচিত কি না। RSS ভারতের সবচেয়ে বড় হিন্দু ন্যাশনালিস্ট সংগঠনগুলোর একটা, যাদের যাত্রা শুরু হয় ১৯২৫ সালে। তারা নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বলে দাবি করে, কিন্তু বহু গবেষক, মানবাধিকার সংস্থা ও সমালোচকের মতে RSS একটি extremist, divisive এবং সহিংসতা-উসকানি দেওয়া সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেওয়া হচ্ছে না, শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক ও non-partisan আলোচনা করা হচ্ছে।


RSS প্রতিষ্ঠা করেন K.B. Hedgewar। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজকে একত্রিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে “হিন্দু রাষ্ট্র” ধারণাকে শক্ত করা। RSS সারা দেশে শাখা চালায়, যেখানে শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা, জাতীয়তাবাদ এবং আদর্শিক শিক্ষা দেওয়া হয়। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং BJP-র বহু শীর্ষ নেতা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে RSS-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা এখনও আছেন। ২০২৫ সালে RSS তাদের ১০০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে, যা তাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের প্রমাণ।


RSS-কে “বদমাশ” বা বিপজ্জনক বলা হয় মূলত তাদের ইতিহাস, আদর্শ ও কার্যকলাপের কারণে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে RSS-এর কিছু শীর্ষ নেতার লেখায় ইউরোপীয় ফ্যাসিস্ট ও নাৎসি চিন্তাধারার প্রভাব ছিল। কিছু লেখায় এমন মন্তব্য পাওয়া যায় যেখানে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ভারতীয় সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে একসময় RSS-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার RSS-কে নিষিদ্ধ করেছিল। যদিও পরে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, কিন্তু এই ইতিহাস আজও সংগঠনটির গায়ে কালো দাগ হয়ে রয়ে গেছে। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা এবং ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরও RSS আবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও তার পরবর্তী দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান, যেখানে RSS ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে।


সমালোচকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো RSS-এর আদর্শ সংখ্যালঘু বিরোধী। তারা বলে RSS এমন এক ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচার করে যেখানে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের “অন্য” হিসেবে দেখা হয়। “শুধু হিন্দুরাই ভারতের প্রকৃত মালিক”—এই ধরনের চিন্তাধারা সমাজে বিভাজন তৈরি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামোফোবিয়া, হেট স্পিচ, গোরক্ষা ভিজিল্যান্টিজম এবং লিঞ্চিংয়ের মতো ঘটনা বেড়েছে, যেগুলোর সঙ্গে RSS-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর আদর্শিক প্রভাব জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক একাডেমিক ও মানবাধিকার গবেষণায় বলা হয়েছে, RSS-এর চিন্তাধারা ঘৃণা ছড়ায় এবং সহিংসতাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে।

RSS VIDEO

RSS-এর গঠনও সমালোচনার বিষয়। সংগঠনটি ভারতে আইনি ভাবে স্বচ্ছ কোনো রেজিস্টার্ড ট্রাস্ট বা সোসাইটি হিসেবে পুরোপুরি নথিভুক্ত নয়, যার ফলে তাদের ফান্ডিং, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তারা VHP, Bajrang Dal-এর মতো সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করে বলে অভিযোগ আছে, যাতে মূল সংগঠন সামনে না এসে প্রভাব খাটাতে পারে। এমনকি আমেরিকায় লবিং কার্যক্রম চালাতে গিয়েও তারা বিতর্কে জড়ায় এবং পরে সেই কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

২০১৪ সালের পর BJP ক্ষমতায় আসার পরে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও বৈষম্যের অভিযোগ বেড়েছে বলে বহু আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উল্লেখ আছে। কিছু বিশ্লেষক RSS-কে একটি far-right নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখেন, যারা ধীরে ধীরে ভারতকে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি US Congress ও আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক রিপোর্টেও RSS-এর নাম উঠে এসেছে।

অন্যদিকে RSS নিজেদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা দাবি করে তারা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যারা দুর্যোগ ত্রাণ, সমাজসেবা ও চরিত্র গঠনের কাজ করে। RSS প্রধান মোহন ভাগবত বহুবার বলেছেন যে ভারতের সংখ্যালঘুরা এই দেশেরই অংশ, তবে তারা যেন বিভাজনের রাজনীতি না করে।

সব মিলিয়ে RSS এমন একটি সংগঠন যাকে কেউ দেশপ্রেমিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলে দেখে, আবার কেউ বিপজ্জনক ও বিভাজনমূলক শক্তি বলে মনে করে। এই বিষয়ে কথা বললে বা শেয়ার করলে তথ্য যাচাই করা জরুরি, কারণ বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সমাজকে ভাগ করতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে RSS-এর সরাসরি প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও BJP-এর মাধ্যমে তাদের আদর্শের প্রভাব দেখা যায়। আলোচনা করা যায়, প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু ফ্যাক্ট আর দায়িত্বশীল ভাষা বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS-এর ইতিহাসটা এখানে সোজা ও সহজ ভাষায় ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে। RSS ভারতের সবচেয়ে বড় হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এটি ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০২৫ সালে ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বড়ভাবে উদযাপন করা হয়েছে।

RSS প্রতিষ্ঠিত হয় ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে, বিজয়াদশমীর দিনে। জায়গা ছিল নাগপুর, তখনকার ব্রিটিশ ভারতের মহারাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, যাকে ডাক্তারজি বলা হয়। তিনি পেশায় ডাক্তার ছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুরুতে তিনি কংগ্রেস দলের সদস্য ছিলেন, কিন্তু গান্ধীজির নন-কোঅপারেশন মুভমেন্ট এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের নীতিতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর মনে হয়েছিল হিন্দু সমাজ বিভক্ত থাকার কারণেই ব্রিটিশরা সহজে ভারত শাসন করতে পারছে। এই চিন্তা থেকেই তিনি RSS তৈরি করেন।

শুরুর সময়ে RSS মাত্র ১৭ জন সদস্য নিয়ে হেডগেওয়ারের নিজের বাড়ির লিভিং রুমে শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা, শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলা তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাকে শক্ত করা। RSS-এর আদর্শ অনেকটাই ভি ডি সাভারকরের হিন্দুত্ব চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

১৯২৫ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত হেডগেওয়ারই ছিলেন RSS-এর প্রথম সরসঙ্ঘচালক। এই সময়ে শাখা ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে শারীরিক কসরত, যোগব্যায়াম, লাঠি খেলা এবং শৃঙ্খলার শিক্ষা দেওয়া হতো। ১৯৪০ সালে হেডগেওয়ারের মৃত্যুর পর মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর, যিনি শ্রী গুরুজি নামে পরিচিত, দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক হন এবং ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন। তাঁর সময়েই RSS দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি Bunch of Thoughts নামে একটি বই লেখেন, যেখানে হিন্দুত্বের আদর্শ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

১৯৭৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বালাসাহেব দেওরাস RSS-এর তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক ছিলেন। তাঁর সময়ে RSS-এর সামাজিক ও সেবামূলক কাজ অনেক বেড়ে যায়। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাজেন্দ্র সিং, যিনি সুরুজি নামে পরিচিত, দায়িত্বে ছিলেন। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কে এস সুদর্শন RSS-এর নেতৃত্ব দেন। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোহন ভাগবত RSS-এর বর্তমান সরসঙ্ঘচালক।

RSS-এর ইতিহাসে কিছু বড় ঘটনা রয়েছে। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর RSS প্রথমবারের মতো নিষিদ্ধ হয়, কারণ গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে একসময় RSS-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৪৯ সালে ভারতীয় সংবিধান মেনে চলার শর্তে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৫১ সালে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি RSS-এর সমর্থনে Bharatiya Jana Sangh তৈরি করেন, যা পরে ১৯৮০ সালে Bharatiya Janata Party বা BJP-তে রূপ নেয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর সরকার RSS-কে দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ করে এবং বহু RSS কর্মী জেলে যান। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পর RSS ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হয় এবং RSS তৃতীয়বার নিষিদ্ধ হয়, যা ১৯৯৩ সালে তুলে নেওয়া হয়।

২০১৪ সালের পর নরেন্দ্র মোদি, যিনি নিজে একজন প্রাক্তন RSS প্রচারক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর RSS-এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে RSS তাদের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বড় আকারে উদযাপন করে।

RSS-এর সংগঠন কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো শাখা ব্যবস্থা। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় সারা দেশে লক্ষ লক্ষ শাখা চলে। RSS-এর অধীনে সংঘ পরিবার নামে অনেক সংগঠন কাজ করে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে BJP, ধর্মীয় ক্ষেত্রে VHP, যুব সংগঠন হিসেবে Bajrang Dal, ছাত্র সংগঠন হিসেবে ABVP, শ্রমিক সংগঠন হিসেবে Bharatiya Mazdoor Sangh এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে Vidya Bharati উল্লেখযোগ্য। RSS-এ কোনো ফর্মাল মেম্বারশিপ ফর্ম নেই। যে কেউ নিয়মিত শাখায় অংশ নিলেই স্বয়ংসেবক হিসেবে পরিচিত হয়।

RSS নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন বলে দাবি করে। তবে সমালোচকদের মতে এটি একটি হিন্দুত্ববাদী এবং আধা-সামরিক ধাঁচের সংগঠন, যার আদর্শ সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যায়। গান্ধী হত্যা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে RSS ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর নাম জড়িয়ে অভিযোগ উঠেছে। RSS তিনবার নিষিদ্ধ হয়েছে, যা তাদের ইতিহাসে বড় বিতর্কের বিষয়। অন্যদিকে RSS দাবি করে তারা সমাজসেবা করে, দুর্যোগে ত্রাণ দেয়, হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায় এবং কোনো ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।

পশ্চিমবঙ্গে RSS-এর উপস্থিতি রয়েছে, বিশেষ করে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায়, তবে দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক দাপটের কারণে তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। BJP-এর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে BJP ৭৭টি আসন পাওয়ার পর, পশ্চিমবঙ্গে RSS-এর সংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।

এস গোলওয়ালকর যিনি শ্রী গুরুজি নামে পরিচিত, তিনি RSS-এর দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক ছিলেন এবং ১৯৪০ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। তার নামে মূলত দুটো বই বা লেখা প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো RSS-এর আদর্শ বা আইডিওলজির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। এখানে কোনো পক্ষ নেওয়া হচ্ছে না, শুধু তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে।

গোলওয়ালকরের প্রথম এবং সবচেয়ে বিতর্কিত বই হলো We or Our Nationhood Defined। এটি প্রকাশিত হয় মার্চ ১৯৩৯ সালে নাগপুর থেকে Bharat Publications-এর মাধ্যমে। বইটি প্রথমে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং পরে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হয়। এডিশন অনুযায়ী বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০-এর মধ্যে। এই বইটিতে গোলওয়ালকর “Nation” বা জাতি কী, সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তার মতে একটি জাতি গঠনের জন্য পাঁচটি জিনিস একসাথে থাকতে হয়, তা হলো দেশ, জাতিগত ঐক্য বা রক্তের সম্পর্ক, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভাষা। তিনি বলেন এই পাঁচটি উপাদান একসাথে থাকলেই একটি জাতি টিকে থাকতে পারে। তার যুক্তি অনুযায়ী, ভারতের ক্ষেত্রে এই পাঁচটি উপাদান হিন্দুদের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে আছে, তাই ভারত আসলে একটি হিন্দু রাষ্ট্র বা হিন্দু নেশন।

এই বইয়ে তিনি বলেন, মুসলিম বা খ্রিস্টানদের মতো অ-হিন্দুরা যদি হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মিলিয়ে না নেয়, তাহলে তারা এই জাতির বাইরের মানুষ বা অভ্যন্তরীণ হুমকি হিসেবে থেকে যায়। এই অংশটাই বইটির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক। বইটিতে হিটলারের জার্মানি এবং মুসোলিনির ইতালির উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে রাষ্ট্র কীভাবে আচরণ করেছে, সেটাকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে জার্মানিতে ইহুদিদের সঙ্গে আচরণের প্রসঙ্গ আসায় এই বইকে নাৎসি চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত বলা হয় এবং সেখান থেকেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়।

এই বইটিকে এক সময় RSS-এর আদর্শিক ভিত্তি বা “বাইবেল” বলা হতো, বিশেষ করে ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৪৮ সালে গান্ধী হত্যার পর এই বইটির রিপ্রিন্ট বন্ধ হয়ে যায়। অনেক বছর পরে, ২০০৬ সালে RSS অফিসিয়ালি জানায় যে এটি গোলওয়ালকরের নিজস্ব মতামত নয়, বরং ভি ডি সাভারকরের লেখা মারাঠি বই Rashtra Mimansa-এর একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ বা রূপান্তর। তবে বহু গবেষক ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, বইটির ভাষা ও ভাবনায় গোলওয়ালকরের নিজস্ব চিন্তাধারাই প্রতিফলিত হয়েছে এবং তাতে স্পষ্টভাবে ইউরোপীয় ফ্যাসিস্ট ও নাৎসি প্রভাব দেখা যায়। বর্তমানে এই বইটি RSS-এর অফিসিয়াল প্রকাশনা বা প্রচারে প্রায় সরিয়ে রাখা হয়েছে।

গোলওয়ালকরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বই হলো Bunch of Thoughts। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে এবং পরে বহুবার নতুন এডিশনে বের হয়েছে। বইটি ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, বাংলা সহ অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই বইটি আসলে গোলওয়ালকরের বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতা, লেকচার এবং কথোপকথনের সংকলন, যা মূলত ১৯৪০ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে দেওয়া হয়েছিল। বইটিতে তিনি RSS-এর উদ্দেশ্য, ভারতের সমস্যা, সমাজ গঠনের পথ এবং স্বয়ংসেবক তৈরি করার ধারণা তুলে ধরেন।

এই বইয়ে গোলওয়ালকর বারবার বলেছেন যে হিন্দুত্বই ভারতের আসল পরিচয়। তিনি মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্টদের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা শত্রু উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে তারা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক। তিনি পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের সমালোচনা করে একে একটি মিথ বা বিভ্রম বলেছেন, কারণ তার মতে এই ব্যবস্থা যোগ্য ও প্রতিভাবান মানুষদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে না। তিনি গান্ধীজি, নেহরু এবং কংগ্রেসের নীতিরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। এই বইয়ে RSS-এর কাজ হিসেবে শারীরিক ও মানসিক শক্তি গড়ে তোলা, শৃঙ্খলা শেখানো এবং প্রয়োজনে সমাজসেবার কথা বলা হয়েছে।

Bunch of Thoughts নিয়েও বড় বিতর্ক আছে। অনেকের মতে বইটি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিভাজনমূলক চিন্তাধারা ছড়ায়। ২০১৮ সালে RSS প্রধান মোহন ভাগবত বলেন যে এই বইয়ের কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল এবং বর্তমান সময়ে সব অংশ প্রাসঙ্গিক নয়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যেগুলো মেলে, RSS শুধু সেগুলোই গ্রহণ করে। তবুও আজও RSS-এর অনেক সদস্য এই বইটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক গ্রন্থ হিসেবে দেখে।

এই দুই বই ছাড়াও গোলওয়ালকরের আরও কিছু লেখা ও সংকলন আছে, যেমন Vicharadhara যা হিন্দি ও মারাঠিতে পাওয়া যায়, এবং Justice on Trial যেখানে ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালের সময়কালের চিঠিপত্র ও বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। তবে RSS-এর আইডিওলজি বুঝতে গেলে মূলত এই দুটি বইই সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়।

ঠিক আছে ভাই, আগের লেখারই কন্টিনিউশন দিচ্ছি, একদম একই ফ্লোতে, কোনো ডট বা স্ট্রাকচার ছাড়া।

গোলওয়ালকরের এই লেখাগুলোর প্রভাব শুধু তার সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে RSS এবং সংঘ পরিবারের চিন্তাধারার ভিত গড়ে দিয়েছে। বিশেষ করে Bunch of Thoughts থেকে RSS-এর সংগঠন কাঠামো, শাখা ব্যবস্থা, স্বয়ংসেবক তৈরির পদ্ধতি এবং “হিন্দু সমাজ আগে, রাজনীতি পরে” এই ধারণা স্পষ্টভাবে আসে। RSS সবসময় বলে তারা সরাসরি রাজনীতি করে না, কিন্তু গোলওয়ালকরের লেখায় পরিষ্কার বোঝা যায় যে রাজনীতিকে প্রভাবিত করাই ছিল দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এই চিন্তাধারা থেকেই প্রথমে Jana Sangh এবং পরে BJP তৈরি হয়।

গোলওয়ালকরের লেখা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের মূল চরিত্র হওয়া উচিত সাংস্কৃতিকভাবে একরকম, অর্থাৎ হিন্দু সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে। তার মতে সংবিধান, আইন বা গণতন্ত্র আসল নয়, আসল হলো জাতির আত্মা। এই কারণেই তিনি ভারতীয় সংবিধানের “সেকুলার” চরিত্র নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। তিনি মনে করতেন সেকুলারিজম ভারতীয় সমাজের স্বাভাবিক চরিত্র নয়, এটা পাশ্চাত্য থেকে আনা ধারণা। এই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে RSS-বিরোধী বিতর্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গোলওয়ালকরের লেখা আজকের দিনে সরাসরি RSS-এর মুখপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের মতে তার চিন্তাধারা এখনো সংগঠনের ভেতরে আদর্শিক রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। RSS প্রকাশ্যে বলে তারা কাউকে শত্রু মনে করে না এবং সংখ্যালঘুরাও এই দেশের অংশ, কিন্তু গোলওয়ালকরের বইয়ের পুরোনো বক্তব্যগুলো সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই কারণেই RSS নেতৃত্ব বারবার বলে যে পুরোনো লেখাগুলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে, আজকের সংগঠন সেই ভাষায় চিন্তা করে না।

বিশেষ করে We or Our Nationhood Defined বইটি নিয়ে RSS আজ খুব সাবধানে কথা বলে। অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প বা প্রচার সামগ্রীতে এই বই প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা পত্র এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্টে এই বই এখনো উদ্ধৃত হয়, কারণ এটি RSS-এর প্রাথমিক ও কাঁচা আদর্শকে প্রকাশ করে। অনেক মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই বইকে ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রের বিরুদ্ধে লেখা একটি দলিল হিসেবে দেখেন।

অন্যদিকে RSS সমর্থকদের মতে গোলওয়ালকরের বক্তব্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। তারা বলে তিনি ভারতের ঐক্য ও শক্তির কথা বলেছেন, কাউকে ধ্বংস করার কথা বলেননি। তাদের যুক্তি হলো, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং বিদেশি আক্রমণের সময়কার বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই বক্তব্যগুলো দেওয়া হয়েছিল। আজকের সময়ে সেগুলো হুবহু প্রয়োগ করার কথা RSS কখনো বলেনি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এম এস গোলওয়ালকরের এই দুই বই RSS-এর আদর্শিক ইতিহাস বুঝতে গেলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এগুলো একদিকে যেমন সংগঠনের চিন্তার উৎস দেখায়, তেমনই অন্যদিকে ভারতের রাজনীতিতে RSS কেন এত বিতর্কিত, সেটাও পরিষ্কার করে। এই বইগুলোর কারণেই RSS-কে শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন না বলে অনেকেই একটি শক্তিশালী আইডিওলজিক্যাল মুভমেন্ট হিসেবে দেখেন।

যদি কিছু জানকারি ভালো থাকে তাহলে আমাদের সঙ্গে থাকবে |



Post a Comment

1 Comments